• বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন
Headline
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডিএনসি’র অভিযানে হেরোইনসহ আটক ১ দেনমোহর পরিশোধের ব্যর্থতায় তিন মাসের জেল ও নিঃস্ব স্বামীর দায়মুক্তির আইনি বিশ্লেষণ! লাখাইয়ে শিশু মানছুরা হত্যা: অপকর্ম ঢাকতে হত্যার অভিযোগ, ডিএনএ পরীক্ষাসহ তদন্তে অগ্রগতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে এমপি নূরুল ইসলাম বুলবুলের মতবিনিময় সভা দেবীগঞ্জে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা: বাসের ধাক্কায় মা ও কন্যার মৃত্যু, আহত আরও দুইজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রাম ও শহরকে গ্রীন ক্লিন করার অঙ্গীকারবদ্ধ — নূরুল ইসলাম বুলবুল ভোগডাবুরী ইউনিয়নে হাট-বাজারে ঘুরে জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন এমপি আব্দুস সাত্তার চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডিএনসি’র অভিযানে ৬ কেজি গাঁজাসহ আটক ১ চাঁপাইনবাবগঞ্জে এতিমদের সাথে নবনির্বাচিত এমপি নূরুল ইসলাম বুলবুলের ইফতার বসতবাড়ীতে অনধিকার প্রবেশ, শ্লীলতাহানি, মারধর, ভাংচুর ও মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

দেনমোহর পরিশোধের ব্যর্থতায় তিন মাসের জেল ও নিঃস্ব স্বামীর দায়মুক্তির আইনি বিশ্লেষণ!

লেখক: এডভোকেট সিরাজ প্রামানিক / ৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

লেখক: এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

যদি কোন ব্যক্তির দেনমোহর পরিশোধের কোন সামর্থ্য না থাকে, ঘর-বাড়ি, জমি-জমা, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ না থাকে তাহলে সেই ব্যক্তির কি ধরণের জেল-জরিমানা হতে পারে আর জেল খাটার পর আইনগতভাবে তাকে পুনরায় দেনমোহর পরিশোধে নতুন সাজা শাস্তি আরোপিত হবে কি-না, দেনমোহর মোকদ্দমায় টাকা আদায় হতে কত সময় লাগে, ডিক্রি প্রাপ্তির পর জারি মোকদ্দমা দায়ের ও টাকা আদায়ে আইনি জটিলতাসহ দেনমোহর নিয়ে যত ব্যতিক্রমী জিজ্ঞাসাসমূহ রয়েছে তা নিয়েই আজকের নিবন্ধ।
দেনমোহর বা খোরপোশ আদায়ের জারি মামলায় আদালত স্বামীকে সর্বোচ্চ ৩ মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ- দিতে পারেন। এটি মূলত টাকা না দেওয়ার জন্য একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। আইনী বাস্তবতা হলো, একই টাকার (একই ডিক্রি) জন্য সাধারণত একজন ব্যক্তিকে বারবার জেলে পাঠানো যায় না। দেওয়ানি কার্যবিধির ৫৮ ধারা অনুযায়ী, যদি স্বামী একবার ৩ মাস জেল খেটে বের হন, তবে ওই একই পরিমাণ দেনমোহরের টাকার জন্য আদালত তাকে দ্বিতীয়বার জেলে পাঠাবেন না। যদি মামলাটি খোরপোশ সংক্রান্ত হয়, তবে প্রতিমাসের বকেয়া খোরপোশের জন্য আলাদা আলাদা ভাবে জেল হওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু দেনমোহর যেহেতু একটি নির্দিষ্ট অংকের এককালীন পাওনা তাই এর জন্য সাধারণত একবারই কারাদ-ের আদেশ হয়।
জেল খাটার পরও যদি স্বামী টাকা পরিশোধ না করেন, তবে সেই রায় কার্যকর করার জন্য ‘জারি মামলা’ করতে হয়। এই জারি মামলার মাধ্যমেই মূলত স্বামীর সম্পত্তি নিলাম করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
নিলামের পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত হয় পারিবারিক আদালত দ্বারা। তবে আদালত নিজে সরাসরি মাঠে গিয়ে নিলাম ডাকেন না। আদালত সাধারণত একজন ‘নিলাম কমিশনার’ নিয়োগ করেন। সাধারণত আদালতের নাজির বা কোনো আইনজীবী এই দায়িত্ব পান। এই কমিশনারের তত্ত্বাবধানেই ঢোল-সহরৎ (ঘোষণা) এবং ডাক সম্পন্ন হয়।
ক্রোক মানে হলো, ওই সম্পত্তি এখন আদালতের নিয়ন্ত্রণে এবং স্বামী তা বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবেন না। সম্পত্তি ক্রোকের পর আদালত নিলামের তারিখ, সময় ও স্থান নির্ধারণ করে একটি বিজ্ঞপ্তি বা ইশতেহার জারি করেন। এটি আদালতের নোটিশ বোর্ডে টাঙানো হয় এবং অনেক সময় স্থানীয় পত্রিকায় বা ঢোল পিটিয়ে এলাকায় প্রচার করা হয় যেন সাধারণ মানুষ নিলামে অংশ নিতে পারে। নির্ধারিত দিনে নিলাম কমিশনারের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে সম্পত্তি বিক্রি করা হয়। যদি নিলামে কেউ অংশ না নেয় বা উপযুক্ত দাম না ওঠে, তবে আদালত অনেক সময় ওই সম্পত্তি সরাসরি স্ত্রীর নামে নামজারি করে দেওয়ার আদেশও দিতে পারেন (বকেয়া দেনমোহরের সমপরিমাণ হিসেবে)।
আর সম্পত্তি নিলাম হলে নিলাম থেকে প্রাপ্ত টাকা আদালতের মাধ্যমে স্ত্রীকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। যদি সম্পত্তির দাম দেনমোহরের চেয়ে বেশি হয়, তবে বাড়তি টাকা স্বামীকে ফেরত দেওয়া হয়। আর যদি ক্রেতা তৃতীয় পক্ষ হয়, তবে আদালত তাকে সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেন। মনে রাখবেন নিলাম শুরু হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত যদি স্বামী টাকা পরিশোধ করে দেন, তবে আদালত নিলাম স্থগিত বা বাতিল করে দেন। তবে বাদীকে কিন্তু আদালতে সম্পত্তির বিবরণ যেমন খতিয়ান, দাগ নম্বর, চৌহদ্দি দিতে হয়। বিবরণ ভুল হলে নিলাম প্রক্রিয়া আটকে যেতে পারে। আর যদি সম্পত্তিটি স্বামীর নিজের না হয়ে পৈতৃক হয় এবং ভাগ-বণ্টন না হয়ে থাকে, তবে তা নিলাম করা বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ।
জেলে থাকা অবস্থায় বা জেল খাটার পর যদি তার কোনো অস্থাবর সম্পত্তি (যেমন: গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, ব্যবসার মালামাল) থাকে, তবে আদালতের নাজিরের মাধ্যমে সেগুলো সরাসরি বাড়ি বা দোকান থেকে উঠিয়ে এনে বিক্রির ব্যবস্থা করা যায়।
স্বামী যদি কোথাও চাকরি করেন, তবে তার নিয়োগকর্তাকে নির্দেশ দিয়ে বেতন থেকে টাকা কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
স্বামী যদি জেল থেকে বের হয়ে তড়িঘড়ি করে তার সম্পত্তি বিক্রি বা অন্যকে দান করে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে আপনিমূল মামলা বা জারি মামলা চলাকালীন আদালতে আবেদন করে ওই সম্পত্তির ওপর ‘নিষেধাজ্ঞা’ বা ‘স্ট্যাটাস কু’) নিতে পারেন। এতে তিনি আইনীভাবে জমিটি আর বিক্রি করতে পারবেন না। আর যদি স্বামী মামলা চলাকালীন বা ডিক্রি হওয়ার ঠিক আগে সম্পত্তি তার মা-বাবা বা ভাই-বোনের নামে নামমাত্র মূল্যে লিখে দেন যাতে দেনমোহর না দিতে হয়, তবে প্রতারণামূলক হস্তান্তর আপনি প্রমাণ করতে পারলে যে এই হস্তান্তর কেবল দেনমোহর ফাঁকি দেওয়ার জন্য করা হয়েছে, তবে আদালত ওই দলিল বাতিল করে সম্পত্তিটি পুনরায় স্বামীর নামে ফিরিয়ে এনে তা ক্রোক করার আদেশ দিতে পারেন।
জারি মামলার ধারা ৫৪ এর অধীনে আপনি আদালতের কাছে আবেদন করতে পারেন যেন স্বামী তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির একটি হলফনামা জমা দেন। সেখানে মিথ্যা তথ্য দিলে তার বিরুদ্ধে আলাদাভাবে ‘আদালত অবমাননা’ বা ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’ দেওয়ার মামলা করা সম্ভব।
দেনমোহর মামলায় বিবাদী (স্বামী) জেল খাটার পর যদি তার আর কোনো দৃশ্যমান সম্পদ (স্থাবর বা অস্থাবর) না থাকে, তবে মামলার ভবিষ্যৎ এবং আইনী বাস্তবতার বিষয়টি বেশ জটিল কিন্তু নিরাশ হওয়ার মতো নয়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও উচ্চতর আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর সমাধান আছে।
যদি বর্তমানে স্বামীর কোনো সম্পদ না থাকে, তবে জারি মামলাটি ‘ব্যর্থ’ হিসেবে সাময়িকভাবে স্থগিত হতে পারে। কিন্তু এটি চিরতরে বন্ধ হয় না। আগামীতে (৫ বা ১০ বছর পর) যদি স্বামী কোনো সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পান বা নিজে উপার্জন করে কোনো সম্পদ কেনেন, তবে স্ত্রী ওই একই জারি মামলার অধীনে সেই নতুন সম্পদ ক্রোক ও নিলামের আবেদন করতে পারেন।
৫১ ডিএলআর (১৯৯৯) ৩৯৯, এই মামলায় আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, দেনমোহর স্ত্রীর একটি আইনগত অধিকার যা স্বামী যেকোনো পরিস্থিতিতে পরিশোধ করতে বাধ্য। যদি স্বামীর সম্পদ না থাকে, তবে আদালত তাকে সময় দিতে পারেন, কিন্তু ডিক্রি বাতিল করতে পারেন না।
রাজিয়া বেগম বনাম আনোয়ার হোসেন, ৩৬ ডিএলআর (১৯৮৪) ২৫৪, মামলায় আদালত বলেছেন, স্বামীর দারিদ্র্য বা অক্ষমতা দেনমোহর আদায়ের পথে চূড়ান্ত বাঁধা হতে পারে না। যদি বর্তমানে সম্পদ না থাকে, তবে ডিক্রিটি কার্যকর করার জন্য স্থগিত রাখা যায় যতক্ষণ না সম্পদ পাওয়া যায়।
যদি স্বামীর সম্পদ না থাকে, তবে স্ত্রী হিসেবে আপনি পৈতৃক সম্পত্তিতে অংশ দাবি করতে পারেন। স্বামী যদি এখনো তার বাবার সম্পত্তি নিজ নামে নামজারি না করে থাকেন, তবে আদালতকে অনুরোধ করা যায় তার ‘অবিভক্ত পৈতৃক অংশ’ চিহ্নিত করে তা ক্রোক করতে।
পরিশেষে একথা বলা যেতেই পারে যে, যদি দীর্ঘ সময় পরও কোনো সম্পদ না পাওয়া যায়, তবে মামলাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থবির হয়ে যেতে পারে। মনে রাখবেন “শূন্য কলস থেকে পানি বের করা সম্ভব নয়।”

সুত্রঃ দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd