নয়ন রহমান, পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় আদালতে বিচারাধীন একটি জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে ব্যক্তিমালিকদের বিরোধ নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ উঠেছে, মহামান্য হাইকোর্টের জারিকৃত স্থিতাবস্থা আদেশ অমান্য করে বিরোধপূর্ণ জমির বন্দোবস্ত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আইন ও আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী।
ভুক্তভোগী জমির ভোগদখলকারী তাজকির-উজ-জামানের দাবি, দেবীগঞ্জ উপজেলার মেকুমারী মৌজার যেসব জমি নিয়ে মামলা চলমান, সেগুলো রেকর্ড অনুযায়ী তার দাদা প্রয়াত তছদ্দুক হোসেন ও দাদি প্রয়াত মহসেনা বেগমের তিন উত্তরাধিকারী—মৃত ডা. তনবিরুজ্জামান, মৃত তছকিনা খাতুন ও মৃত তছরিফা খাতুনের নামে ছিল। সেই সূত্রে উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা জমির বৈধ মালিক।
তিনি জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২২ সাল পর্যন্ত নিয়মিত ভূমি রাজস্ব পরিশোধ করে জমি ভোগদখলে ছিলেন। এ সংক্রান্ত সকল রাজস্ব রশিদ ও কাগজপত্র তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও দাবি করেন।
আদালতে চলমান মামলার বিভিন্ন নথি অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে মৃত ডা. তনবিরুজ্জামান পঞ্চগড় বিজ্ঞ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং–১৪/৯৪)। ওই মামলায় ২৫ আগস্ট রায় এবং ৩১ আগস্ট ডিক্রি জারি হয়। পরবর্তীতে তাজকির-উজ-জামানের পিতা পঞ্চগড় জেলা জজ আদালতে আপিল করেন (আপিল নং–২৩/৯৪), যার রায় ঘোষণা করা হয় ১৯৯৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর।
পরে চলতি বছরের ২০২৫ সালে ওই রায়ের বিরুদ্ধে তাজকির-উজ-জামান মহামান্য হাইকোর্টে একটি সিভিল রুল দায়ের করেন (মামলা নং–৫৩০/২০২৫)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে মহামান্য হাইকোর্ট বিরোধীয় তফসিলবর্ণিত জমির ওপর তিন মাসের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন।
তাজকির-উজ-জামান অভিযোগ করে বলেন,
“উপজেলা ভূমি অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করেছি। এছাড়াও আমার ভাই তাকমিলউজ্জামান এর ২৬-০২-১৯৮৫ তরিখে রেজিস্ট্রিকৃত ১৫৫২ নং দলিল আছে।
অথচ পরবর্তীতে ওই জমিগুলোকে সরকারি জমির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যদিও তা এখনো খাস খতিয়ানে রেকর্ড হয়নি। চলমান মামলার মধ্যেই হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা আদেশ অমান্য করে জমির বন্দোবস্ত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।”
এদিকে সম্প্রতি স্থানীয় ভূমি ও তহসিল অফিস যৌথভাবে জমির একটি অংশে মাপজোখ করে লাল পতাকা টানালে এলাকায় অসন্তোষ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিচারাধীন জমিতে এ ধরনের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ আদালতের আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের তহসিলদার মো. আবুল হোসেন সরকার বলেন,
“তফসিলবর্ণিত জমির যেসব দাগে খাজনা পরিশোধ হয়েছে, সেগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। তবে একই মৌজায় একাধিক দাগ সরকারি খতিয়ানভুক্ত ও খাস নথিভুক্ত থাকায় ব্যক্তিমালিকানার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। যেহেতু জমিগুলো আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশের আওতাভুক্ত, সেখানে কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা আইনসঙ্গত নয়।”
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “যেসব জমি খাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো এখনো কোনো পক্ষকে হস্তান্তর করা হয়নি। বিষয়টি বর্তমানে অফিসিয়াল প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
স্থানীয়দের আশঙ্কা, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে এভাবে জমির বন্দোবস্ত দেওয়া হলে যে কোনো সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তারা দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ এবং হাইকোর্টের আদেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।