মোঃ মকবুলার রহমান
স্টাফ রিপোর্টার:
জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে গত বৃহস্পতিবার রাজসাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।প্রথম আলো সুত্রে এমনটি জানা গেছে । বাংলায় রাজসাক্ষী বলতে বোঝানো হয় সেই অপরাধীকেই, যিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতের সামনে খোলামেলা সাক্ষ্য দেন এবং সহঅপরাধীদের অপরাধও প্রকাশ করেন।
রাজসাক্ষী কে?
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৭, ৩৩৮ ও ৩৩৯ ধারায় রাজসাক্ষী সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। আইনের ভাষায়, কোনো গুরুতর অপরাধে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত কোনো ব্যক্তি যদি আদালতের কাছে পুরো সত্য ঘটনা প্রকাশ করেন, অপরাধের দায় নিজের ওপর নেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধেও অকপট সাক্ষ্য দেন, তবে আদালত তাঁকে ক্ষমা করতে পারেন। এই ক্ষমার বিনিময়ে শর্ত থাকে, তিনি সম্পূর্ণ সততার সঙ্গে সব তথ্য প্রকাশ করবেন।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা
প্রখ্যাত আইনবিদ গাজী শামসুর রহমান তাঁর ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ভাষ্য’ গ্রন্থে লিখেছেন—রাজসাক্ষীকে আদালত ক্ষমা করতে পারেন, তবে তাঁর অঙ্গীকার থাকতে হবে যে অপরাধের প্রতিটি তথ্য তিনি সঠিকভাবে আদালতে তুলে ধরবেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, রাজসাক্ষী হতে হলে আসামিকে নিজের অপরাধ স্বীকার করতে হয় এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে হেফাজতে রাখা হয়।
অন্যদিকে আইনজীবী এহসানুল হক সমাজীর মতে, রাজসাক্ষী সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের জড়িত থাকার বিষয় স্বীকার করে শর্তসাপেক্ষে সব অপরাধীর কৃতকর্ম আদালতে প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রেক্ষাপটে আইনজীবী শিশির মনির জানান, এখানে সাক্ষ্য আইন বা ফৌজদারি কার্যবিধি সরাসরি প্রযোজ্য না হলেও রাজসাক্ষীর মূল দর্শন ফৌজদারি কার্যবিধি থেকেই এসেছে।
মামুনের প্রেক্ষাপট
আইনজীবী শিশির মনিরের ভাষ্যমতে, সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুন ট্রাইব্যুনালে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন এবং এখন তিনি প্রকাশ্য আদালতে সাক্ষ্য দেবেন। তিনিই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম আসামি, যিনি রাজসাক্ষী হলেন। তবে তিনি চূড়ান্তভাবে মামলা থেকে অব্যাহতি পাবেন কি না, তা নির্ভর করবে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর। প্রসিকিউশন প্রধান তাজুল ইসলামও জানিয়েছেন—মামুনের সাক্ষ্যে যদি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উন্মোচিত হয়, তাহলে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ক্ষমা বা হালকা দণ্ড দিতে পারেন।
রাজসাক্ষীর বিরল নজির
উপমহাদেশে রাজসাক্ষী হওয়ার নজির খুব কম। বাংলাদেশে অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হলো কুখ্যাত এরশাদ সিকদারের দেহরক্ষী নূরে আলমের ঘটনা। তিনি ২০০৪ সালে ব্যবসায়ী আবদুল আজিজ হত্যা মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিলেন। আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করার পাশাপাশি এরশাদ সিকদারের অপরাধের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছিলেন তিনি। এ কারণেই নূরে আলম ওই মামলায় খালাস পান।