মোঃ মকবুলার রহমান
স্টাফ রিপোর্টার:
বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের কিছু অংশ অসাংবিধানিক ঘোষণা করে অবৈধ ও বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত ক্ষমতা সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরে এসেছে। ইউএনবি সুত্রে এমনটি জানা গেছে ।
মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। আদালত বাহাত্তরের সংবিধানের মূল ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করেন এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। ফলে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে এসে বিচার বিভাগ আরও স্বচ্ছ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেল।
রিটের পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “এই রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হলো। এখন থেকে বিচারকদের বদলি বা শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। নির্বাহী কর্তৃপক্ষের প্রভাবের ভয় ছাড়াই তারা নিরপেক্ষভাবে বিচারকাজ পরিচালনা করতে পারবেন।” তিনি একে ‘ঐতিহাসিক রায়’ আখ্যা দেন।
রিটটি করেন সুপ্রিম কোর্টের সাত আইনজীবী— মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন, মো. জহিরুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল্লাহ সাদিক, মো. মিজানুল হক, আমিনুল ইসলাম শাকিল ও যায়েদ বিন আমজাদ। তারা যুক্তি দেন, ১৯৭৪ সালের চতুর্থ সংশোধনী ও পরবর্তী সময়ে করা পরিবর্তনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। অথচ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকা বাধ্যতামূলক।
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ছিল। কিন্তু পরবর্তী সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়, যা কার্যত আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
আইনজীবীরা মনে করছেন, হাইকোর্টের এ রায় বাস্তবায়িত হলে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত হবে। বিচারপতিরা আর রাতারাতি বদলির আশঙ্কা ছাড়াই নির্ভয়ে রায় দিতে পারবেন। তিন মাসের মধ্যে পৃথক সচিবালয় গঠিত হলে সুপ্রিম কোর্ট নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু একটি আদালতের রায় নয়, বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক। এই রায়ের ফলে গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ বিচার বিভাগ আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে যাচ্ছে।