মোঃ মকবুলার রহমান
স্টাফ রিপোর্টার:
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের রাজসাক্ষী হিসেবে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের দেওয়া জবানবন্দি আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের একটি স্পষ্ট দলিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।বাসস সুত্রে জানা গেছে তিনি বুধাবার বাসস’কে বলেন, “চৌধুরী মামুনের সাক্ষ্য শেখ হাসিনার আমলের ভয়াবহ দমননীতির অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ।”
গত মঙ্গলবার বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি দেন মামুন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলন দমন করতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ফোনে তাকে জানান যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর সেই নির্দেশ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং একই দিন থেকেই আন্দোলন দমনে গুলি চালানো শুরু হয়।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ ছিলেন সবচেয়ে আগ্রহী। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ ছিল—যে কোনো মূল্যে আন্দোলন ঠেকাতে হবে।
জবানবন্দিতে আরও উঠে আসে, শেখ হাসিনাকে এ ধরনের সিদ্ধান্তে প্ররোচিত করতেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান, আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, ইনু, নানক, মির্জা আজম, তাপসসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হারুন অর রশীদ। সরকারের মদদপুষ্ট বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও ব্যবসায়ীরাও এই পদক্ষেপকে উৎসাহিত করেছিলেন।
সাবেক আইজিপি আরও জানান, ১৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রতিরাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমন্ডি বাসায় “কোর কমিটি” বৈঠক বসত। সেখানেই ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত হয় এবং ডিবি প্রধান হারুন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
৪ আগস্ট গণভবনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। সেখানে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে আন্দোলন ঠেকানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ৫ আগস্ট “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচি ভেস্তে দিতে সেনা কন্ট্রোল রুম থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়।
চৌধুরী মামুন আরও বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের রাতে ভোটকেন্দ্রে ব্যালট ভরার পরামর্শ তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী সরাসরি শেখ হাসিনাকে দিয়েছিলেন। পরে প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হয়। যেসব কর্মকর্তা এতে সহযোগিতা করেন, তারা পরবর্তীতে পুরস্কৃত হন।
তিনি স্বীকার করেন, র্যাবের টিএফআই সেলসহ বিভিন্ন গোপন বন্দিশালায় বিরোধী মতের মানুষদের আটকে নির্যাতন ও হত্যার সংস্কৃতি চালু ছিল। এসব কর্মকাণ্ডের নির্দেশ আসত প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে, যা প্রয়োগ হতো চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করে সরাসরি র্যাবের গোয়েন্দা শাখার কাছে।
রাজসাক্ষী হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মামুন বলেন, “আমি লজ্জিত ও অনুতপ্ত। জুলাই আন্দোলনে যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ হয়েছে, তার দায় স্বীকার করছি। বিবেকের তাড়নায় ও সত্য উদঘাটনের স্বার্থে আমি আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।”
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, সাবেক আইজিপির সাক্ষ্য অখণ্ডযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও এটি দুর্বল প্রমাণ করার সুযোগ নেই। এটি শুধু জুলাই-আগস্ট নয়, গত দেড় দশকে সংঘটিত গুম-খুনের ঘটনাগুলোরও দলিল হয়ে থাকবে।
এই মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে ছিলেন তাজুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন আইনজীবী। অভিযুক্ত শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী দায়িত্ব পালন করেন। আর রাজসাক্ষী চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।